বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০১:৫৩ পূর্বাহ্ন

ইউনাইটেড পারপাস ও পেনিএ্যাপিল এর যাকাতের ২১ লাখ ৪০ হাজার টাকা বিতরণে অনিয়ম

সৈকত
  • আপডেট করা হয়েছে শুক্রবার, ৭ মে, ২০২১
  • ৪৬ বার পড়া হয়েছে

রামুতে বিদেশী দাতা সংস্থার দেয়া যাকাতের ২১ লাখ ৪০ হাজার টাকা বিতরণে ব্যাপক দূর্নীতি, স্বজনপ্রীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। উপজেলার রাজারকুল ইউনিয়নে গত এক সপ্তাহে কয়েক দফায় ৪২৮ হতদরিদ্র পরিবারকে ৫ হাজার টাকা করে বিতরণ করার কথা ছিলো। কিন্তু টাকার অধিকাংশ পেয়েছেন বিতরণে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধি-চৌকিদারগন এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা।

আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইউনাইটেড পারপাস ও পেনিএ্যাপিল’ পবিত্র রমজানে মহামারি করোনায় গ্রামের কর্মহীন দরিদ্র ও অসহায় পরিবারে হাসি ফুটাতে যাকাত ফান্ডের এসব টাকা বিতরণ করলেও শেষ পর্যন্ত এসব টাকা প্রকৃত দরিদ্রদের মুখে হাসি ফোটাতে পারেনি। উল্টো স্বচ্ছল ব্যক্তি এবং মেম্বার-চৌকিদারদের মাধ্যমে ব্যাপক লুটপাটের ঘটনায় জনমনে ক্ষোভ বিরাজ করছে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে রাজারকুল ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নং ওয়ার্ডের চৌকিদার মো. হাশেম নিজের পরিবারের ৮ জন সদস্য ৫ হাজার করে যাকাতের টাকা নিয়েছেন। এরমধ্যে চৌকিদার হাশেম এবং তার ছেলে সালাহ উদ্দিনও রয়েছেন। টাকা নেয়া এ পরিবারের অন্যান্যরা হলেন-চৌকিদার হাশেমের ভাতিজা আমান উল্লাহ, নুরুল আলম, আজিম, রশিদ আহমদ, শাহ আলম ও নুরু। স্থানীয়রা জানিয়েছেন-৫ হাজার টাকা করে যাকাতেরে অর্থ হাতিয়ে নেয়া এসব ব্যক্তিরা সরকারের দেয়া আড়াই হাজার টাকা করে অনুদানও পেয়েছেন।

৩ ওয়ার্ডের মেম্বার ফরিদুল আলম অনিয়মের এ বিষয়টি স্বীকার করে জানিয়েছেন-তিনি চেয়ারম্যানের নির্দেশে একটি তালিকা দিয়েছিলেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দাতা সংস্থার একজন মাঠকর্মীর যোগশাজসে চৌকিদার হাশেম তাঁর দেয়া নামগুলো কেটে নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে আরো কিছু লোকজনের নাম তালিকাভুক্ত করে। মেম্বার ফরিদুল আলম আরো জানিয়েছেন-ইউপি চেয়ারম্যান মুফিজুর রহমানের ছত্রছায়ায় চৌকিদার হাশেম স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে দরিদ্র লোকজনের পরিবর্তে স্বচ্ছল লোকজনকে যাকাতের এসব অর্থ বিতরণ করেছেন। যা চরম দুঃখজনক। তিনি এ অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন।

একই ওয়ার্ডের জাকের আহমদের ছেলে আবদুল হামিদ একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ি ও স্বচ্ছল ব্যক্তি হয়েও যাকাতের টাকা পেয়েছেন। অথচ তারই হতদরিদ্র ভিক্ষুক ভাই আবুল কাশেম যাকাতের এ সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডের মেম্বার ছৈয়দ নুর নিজের পিতা আবুল হোছন সহ পরিবারের একাধিক সদস্যদের যাকাতের অর্থ পেতে সহায়তা করেছেন। ২ নং ওয়ার্ডের মেম্বার শামসুল আলমের ভাই ডাকাতি, বলাৎকার সহ একাধিক মামলার আসামী আবদুল্লাহ যাকাতের অর্থ পেয়েছেন। শুধু আবদুল্লাহ নয়, মেম্বার শামসুল আলমের ভাই সহ পরিবারের আরো কয়েকজন সদস্য পেয়েছেন ৫ হাজার টাকা করে দেয়া দরিদ্র মানুষের এ অর্থ।

২নং ওয়ার্ডের হতদরিদ্র এবং জটিল রোগে (পাইলস) আক্রান্ত হোছন আহমদ যাকাতের এ অর্থ সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অথচ তার বিত্তশালী ভাই আলী আহমদ কৌশলে যাকাতের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন।

জানা গেছে-যাকাতের অর্থ বিতরণে রাজারকুল ইউনিয়নে মেম্বারদের চেয়ে চৌকিদারদের প্রভাব ছিলো চোখে পড়ার মতো। ৪ নং ওয়ার্ডের চৌকিদার আবু ছৈয়দ, ৫ নং ওয়ার্ডের শফি, ৬ নং ওয়ার্ডের ইউনুচ সহ প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডে চৌকিদাররা প্রভাব খাটিয়ে নিজের পরিবারের সদস্য, নিকটাত্মীয় এবং অর্থের বিনিময়ে স্বচ্ছল লোকজনকে যাকাতের টাকা পেতে তালিকাভুক্ত করতে ভুমিকা রেখেছেন।

ইউপি সদস্য ফরিদুল আলম জানিয়েছেন-প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডের চৌকিদারদের সাথে চেয়ারম্যান রয়েছে অন্যরকম সম্পর্ক। তাই এ ইউনিয়নে সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ সহায়তা, যাকাত বিতরণ, পরিষদের নিত্যদিনের কর্মকান্ডে মেম্বারদের চেয়ে চৌকিদারদের কদর অনেক বেশী। এর মূল কারণ হলো -চৌকিদারদের মাধ্যমে এসব সহায়তা বিতরণে অর্থ আদায় করা সম্ভব। যা মেম্বারদের মাধ্যমে সম্ভব হয়না।

রাজারকুল ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবকলীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল হাকিম ও সহ সভাপতি আবদুল হামিদ জানিয়েছেন-যাকাতের বিপুল অর্থ হরিলুট হয়েছে। প্রকৃত হতদরিদ্র, অসহায় ব্যক্তি চিহ্নিত করে তালিকা করা হয়নি। শুধু মাত্র চেয়ারম্যান ও তার অপকর্মে সহযোগি হিসেবে চিহ্নিত চৌকিদারগণ যাকাতের টাকা নিজেদের লোকজনকে বিতরণ করেছেন।

কক্সবাজার জেলা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি ও রাজারকুল ইউনিয়ন পরিষদের চার বার নির্বাচিত চেয়ারম্যান জাফর আলম চৌধুরী বিদেশী দাতা সংস্থার দেয়া যাকাতের বিপুল অর্থ হতদরিদ্র লোকজনের পরিবর্তে স্বচ্ছল ব্যক্তি এবং বিএনপি-জামাতের নেতাকর্মীদের বিতরণ করার অভিযোগ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন- কয়েকদফা এ অর্থ বিতরণ করা হয়। প্রথমবার টাকা বিতরণে অনিয়মের বিষয়টি জানার পর তিনি রামু উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রণয় চাকমাকে বিষয়টি অবহিত করেন।

ফিড আওয়ার ওয়ার্ল্ড ২০২১’ এর আওতায় রামুর রাজারকুল ইউনিয়নে ৪২৮ দরিদ্র ও অসহায় পরিবারকে শর্তহীন আর্থিক সহায়তা হিসেবে ২১ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা বিতরণ ৫ মে সম্পন্ন হয়েছে। জনপ্রতিনিধি-চৌকিদারদের রমরমা স্বজনপ্রীতি ও দূর্নীতির কারণে মহৎ এ উদ্যোগটি নিয়ে এখন চলছে সমালোচনার ঝড়।

রাজারকুল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মুফিজুর রহমান বলেন- যাকাতের এ অর্থ বিতরণে আমার কোন ভূমিকা ছিলো না। সংশ্লিষ্ট দাতা সংস্থার কর্মীরা পরিষদের মেম্বার-চৌকিদারদের নিয়ে যাচাই বাছাই করে তালিকা করেছেন। এখানে কোন অনিয়ম হয়েছে কিনা তিনি জানেন না বলে জানান।

প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ‘ইউনাইটেড পারপাস’ এর সহকারী প্রকল্প কর্মকর্তা তারেকুল ইসলাম জানিয়েছেন-উপজেলা প্রশাসন, পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বার, চৌকিদারদের সহায়তায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে এ তালিকা তৈরী করা হয়েছে।

শুধুমাত্র হতদরিদ্রদের জন্য এ যাকাত সহায়তা দেয়া হয়েছে। যারা সরকারি সহায়তা পান তাদের এ অর্থ দেয়া হয়নি। তবে পরিষদের মেম্বার, চৌকিদার এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্বচ্ছল এবং সরকারি সহায়তা পাওয়া ব্যক্তিরা এ অর্থ পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। এমনকি তিনি কোন অনিয়ম থাকলে তা ঈদুল ফিতরের পরে সংস্থাটির উখিয়াস্থ অফিসে গিয়ে অবহিত করার অনুরোধ জানান।

রামু উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রণয় চাকমা জানিয়েছেন- দাতা সংস্থাটি ইউনিয়ন পরিষদের সাথে সমন্বয় করে হতদরিদ্র লোকজনের তালিকা করেছিলো। টাকা বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ পেলে সুষ্ঠু তদন্ত করা হবে। অনিয়ম-দূর্নীতি, স্বজনপ্রীতি হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

কমেন্ট করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
themesba-lates1749691102